সোমবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৭ ১৪২৬   ২৩ মুহররম ১৪৪১

৫৩১

সিলেট দাপটে ছাত্রলীগ মাঠছাড়া ছাত্রদল

এ টি এম তুরাব::

প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২০ ০৮ ৫৮  

সিলেটে সরকারি দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনে ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও মাঠের বিরোধী দল বিএনপি’র ছাত্র সংগঠন কোনঠাসার মধ্যে রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগে চলছে খাই খাই অবস্থা। বছরের পর বছর কমিটি ছাড়াই চলছে সংগঠনের কার্যক্রম। আর এই কারণে লেগে আছে কলহ, কোন্দল, গৃহবিবাদ। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিজেদের মধ্যে সংঘাত সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে তারা। ঘটছে একের পর এক খুনের ঘটনা। ক্ষণে ক্ষণে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে ছাত্রলীগ।
মাঠের বিরোধী দল বিএনপি’র অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদলে এখন বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলেও ছাত্রদলে অভ্যন্তরে রেষারেষি আর দলাদলি-গ্রুপিং কমেনি। সংগঠনের নেতাকর্মীরা পুলিশী হয়রানীর ভয়ে রাজপথে থাকাতো দূরের কথা, বাসা বাড়িতে থাকতে পারছে না।
সূত্রে জানা যায়, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের দাপটে সিলেটের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্য ছাত্র সংগঠনের প্রকাশ্য কোন তৎপরতা নেই। এর ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতির গণতান্ত্রিক চর্চা এখন বন্ধ। ছাত্রলীগকে নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন খোদ আওয়ামী লীগ নেতারা। নগরীতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দফায় দফায় সংঘাত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে তারা। এমসি কলেজ, মদন মোহন কলেজ, সরকারি কলেজ ও শাবি ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরকে অনেক আগেই বিতাড়িত করে ছাত্রলীগ। এরপর থেকে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী নিজেরা। নিজেরা নিজেরাই খুনোখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে। গত দশ বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরিণ কোন্দলে নগরীতে বেশ কয়েকটি হত্যাকান্ড ঘটেছে। দলীয় কোন্দলে পাড়ায়-মহল্লায়ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। নগরীর অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসাবে পরিচিত শাহজালাল উপশহর। এই এলাকাকে ঘিরেই ছাত্রলীগের কাউন্সিলর গ্রুপ ও যুবলীগ নেতা শামীম ইকবাল-জাকির গ্রুপ সংঘাত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত। সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকায় ছোট-বড় অন্তত ২০বার মারামারি, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় অনেকে পঙ্গুত্ব বরণও করেছেন। এর ফলে চরম আতঙ্কে রয়েছে এলাকার বাসিন্দারা। অন্যদিকে প্রায়ই এমসি কলেজ ক্যাম্পাস ও ছাত্রাবাস দখল নিতে টিলাগড় ছাত্রলীগের বিবাদমান দুই গ্রুপের উপ-গ্রুপের দুই নেতার অনুসারীরা সংঘাত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। কলেজের সবক’টি ছাত্রাবাস বন্ধও ছিলো দীর্ঘদিন। ছাত্রলীগের সহিসংতার পর কেন্দ্র থেকে কিছু নেতাকে বহিষ্কার করা হলেও বহিষ্কৃত ওই নেতারা ঘুরেফিরেই থেকে যাচ্ছে ছাত্রলীগে।
২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীম তুষারকে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ী বহিষ্কারসহ মহানগর কমিটিও বাতিল ঘোষণা করা হয়। তবে গত ২৫ জানুয়ারি তুষারের স্থায়ী বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।
সংঘাতের জেরে ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ সিলেট জেলা ছাত্রলীগের কমিটি ও দীর্ঘদিন থেকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়া এবং সেক্রেটারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগে ২০১৮ মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি বাতিল করা হয়। এরপর দীর্ঘ দিন পেরিয়ে গেলেও কমিটি বিহীন অবস্থায় রয়েছে সিলেট ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ কর্মীদের কর্মকান্ডে এখানকার সাবেক ছাত্র নেতারাও তাক্ত-বিরক্ত। কে শোনে কার কথা, সবকিছুতেই ছাত্রলীগের নাম। এমন পরিস্থিতি এখন সিলেটে বিরাজ করছে। সিলেটে বেপরোয়া ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।
জানা যায়, শুরুতে ২০১০ সালের ১০ জুলাই টিলাগড়ে খুন হন এমসি কলেজের গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছাত্রলীগ কর্মী উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। তাকে খুনের ঘটনায় সেই সময় বিলুপ্ত ঘোষিত হয় জেলা ছাত্রলীগের কমিটি। বিলুপ্তির ৩ মাস পর ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর পংকজ পুরকায়স্থকে সভাপতি ও ফরহাদ হোসেন খানকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন জেলা কমিটি গঠিত হয়। ওই সময় এমসি কলেজে ছাত্রলীগের প্রতিপক্ষ গ্রুপের ওপর গুলিবর্ষণ, হামলা ও ছাত্রাবাসে অগ্নিসংযোগসহ সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডের কারণে পংকজ পুরকায়স্থকে ২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২২ ফেব্রুয়ারি দল থেকেই তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান হিরণ মাহমুদ নিপু। ২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সিপিবি-বাসদের আয়োজিত সমাবেশে হামলার ঘটনায় আবারো বিলুপ্ত হয় জেলা কমিটি। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শাহরিয়ার আলম সামাদকে সভাপতি ও এম রায়হান চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা ছাত্রলীগের কমিটি গঠন করা হয়। তবে ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ টিলাগড়ে ছাত্রলীগের সংঘর্ষের জেরে কমিটি স্থগিত থাকে ৯ মাস। এরপর ছাত্রলীগ কর্মী মিয়াদ হত্যায় তৃতীয়বারের মতো কমিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
এ দিকে বিএনপির অঙ্গ সহযোগী ছাত্র সংগঠনের বেহাল ও অগোছালো অবস্থা। ছাত্রদল বিএনপির ভ্যানগার্ড বলে পরিচিত অথচ আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে এখন আর তাদের খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। আবার ছাত্রলীগের একচ্ছত্র দখলবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছেনা ছাত্রদল। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যাল, এমসি কলেজ, মদন মোহন কলেজসহ কোন ক্যাম্পাসে তাদের অবস্থান নেই। বেশিরভাগ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও ওয়ার্ডে নেই ছাত্রদলের কমিটি। মহানগর ও জেলায় কমিটি থাকলেও কার্যক্রম নেই। সরকার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদলের ভূমিকা না থাকলেও নিজেদের মধ্যে পদপদবি নিয়ে তাদের মারামারিতে লিপ্ত হতে দেখা যায়। মহানগর এবং জেলায় রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এমন অনেক ছাত্রদল নেতা এখন কারাগারে। আবার অনেকে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। সরকার বিরোধী আন্দোলনে মিথ্যা মামলায় ঘরছাড়া অনেক ছাত্রদল নেতা। অভিযোগ রয়েছে, কমিটি গঠনের সময় ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। নেতাদের পছন্দের যারা তাদের কমিটিতে পদ দেওয়া হয়। আর এ কারণে ছাত্রদলের রাজনীতিতে স্থবিরতা বিরাজ করছে।
সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান নেছার বলেন, দলকে সুসংগঠিত করতে তারুণ্য নির্ভর জেলা কমিটি প্রয়োজন। যে নেতৃত্ব আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবে। আমরা তৃণমূল থেকে কেন্দ্রের কাছে এমন দাবিই রাখি।
সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবদুল বাছিত রুম্মান বলেন, মূলত সেন্ট্রাল কমিটির দিকেই আমরা এখন তাকিয়ে আছি। আমরা আশাবাদী খুব শীঘ্রই কমিটি গঠন হয়ে সিলেট ছাত্রলীগ চাঙ্গা হবে। রুম্মান ছাত্রলীগের ত্যাগী ও যোগ্যদের নিয়ে দ্রুত নতুন কমিটি গঠন করে ছাত্রলীগকে গতিশীল করার আহবান জানান তিনি।

 

 

Dream Sylhet
ড্রীম সিলেট
ড্রীম সিলেট
এই বিভাগের আরো খবর