শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৪ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

২৪৩

সিলেটে ভার্চুয়ালের অপব্যবহার ভাঙছে পারিবারিক বন্ধন

এ টি এম তুরাব:: 

প্রকাশিত: ২৯ জুন ২০১৯ ১৬ ০৪ ১০  

জাকির-তামান্না (ছদ্ম নাম) দুজনের পরিচয় ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে। সে থেকে তাদের দুজনের ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে চ্যাটিং, ফোনে কথা বলা, দেখাসাক্ষাত। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো। এ ভাবে একে অপরকে দীর্ঘদিনের চেনাজানা। ততোদিনে তাদের সম্পর্কটা গভীর হয়েছে। দুজন বিয়েও করেছেন, সংসারও চলছে বেশ ভালো ভাবে। জাকির পেশায় অনেকটা বেকার হলেও বাবার আদরের ছোট সন্তান হওয়াতে কোন দিন অভাব বুঝেনি এবং পরিবার থেকে বুঝাতেও দেওয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের স্বামী-স্ত্রী’র মধ্যে মনোমালিন্যতা দেখা দিলেও পরে আবার ঠিকঠিক। এভাবে বছর দেড় যেতে তাদের ঘর আলোকিত করে তুলে এক ফুঁটফুঁটে পুত্র সন্তান। আর পুত্রের বয়স যখন পাঁচ মাসের কাছাকাছি। হঠাৎ কোন একদিন রাতে জাকির-তামান্নার মধ্যে দেখা দেয় ঝগড়া, দুজনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়। একপর্যায়ে জাকির-তামান্নাকে থাপ্পড় মারে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তামান্না রুমে একা একা কান্নাকাটি করতে থাকে। ওই রাতে জাকিরও বাসায় ফিরেনি। এভাবে ধীরে ধীরে তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে।  
    বিয়ের আগের ব্যাপারটাই ছিল তাদের আলাদা, সুযোগ পেলেই দেখা করা। তবে বিয়ের পর বেশ কয়েক মাস পর জাকির (ছদ্ম নাম) নিজে ব্যবসায় যুক্ত হয়। ব্যবসার এ সময়টুকু বাহিরে থাকে তখন জাকিরকে খুব মিস করে তামান্না (ছদ্ম নাম)। তামান্না বোঝে সংসারের জন্যই দিনরাত খেটে যাচ্ছে ছেলেটা, তাই কোন ধরনের অভিযোগ নেই তার। তামান্না বরাবরই এমন, সব কিছুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয় নিজেকে। এজন্য একলা থাকার সময়টুকু ঘুরে বেড়ায় বন্ধুদের খবরের দেয়ালে। মানে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের মধ্য দিয়ে। এ পর্যায়ে তামান্না জেনে গেলে তার স্বামী একটি পরকিয়া সম্পর্ক জড়িয়ে পড়েছে। জাকিরকে কৌশলে অনেক বার তামান্না বুঝালেও কাজ হয়নি। দেখা দিলো দুজনের মধ্যে ফাটল। কিন্তু এই সামাজিক মাধ্যমেই যে আসক্তি হয়ে তাঁদের সম্পর্কের ভাঙ্গন হয় দাঁড়াবে তা তাঁরা বুঝতে পারেনি। জাকির-তামান্না দাম্পত্তির মতো এ রকম অনেক পরিবার রয়েছে সিলেটে।
    ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ইন্টারনেটের ব্যবহার যেরকম দ্রুত বাড়ছে। এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে সাইবার অপরাধও। যা প্রতিরোধ করতে না পারলে ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাবে এমনটি বলেছেন বিশেজ্ঞরা। শুধু ফেসবুক না, বর্তমানে আরেকটি জনপ্রিয় সাইট হলো ইন্সটাগ্রাম। ইতোমধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যারা ইন্সটাগ্রামে বেশি আসক্ত, তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা গেছে। অসামাজিক আচরণের ফলে তারা নিজেদের পিতা-মাতার সঙ্গে কথা বলতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছে। এভাবে ভার্চুয়াল জগতে আসক্তির ফলে মানুষ সত্যিকার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ধীরে ধীরে সৃষ্টি হচ্ছে পারিবারিক ভাঙ্গন। বিপুল সংখ্যক মানুষের বিপরীতে নেতিবাচক চিত্রও মেলে। ফেসবুক-ইন্সটাগ্রামের মতো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে অনেক ধরনের অপকর্ম হচ্ছে। দিনে দিন বেড়েই চলছে ‘সাইবার’ অপরাধ। ইন্টারনেটে ব্যক্তির আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও ছড়ানোর ঘটনা ক্রমেই বাড়েছে। পারিবারিক বিদ্বেষ সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে বিরোধ তৈরি, উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য প্রচার, অন্তরঙ্গ ভিডিও ও ছবি আপলোড, ফেক অ্যাকাউন্ট তৈরি, পাসওয়ার্ড বা গোপন নম্বর অনুমান করে আইডি হ্যাক’র মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। এ থেকে বাদ যাচ্ছে না ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে বিদ্বেষমূলক প্রচার-প্রচারণা।  
ফেসবুকে স্ট্যাটাস ও ভিডিও আপলোড দিয়ে অনেকে মারামারি, দেখা নেওয়ার সহ আত্মহত্যারও হুমকি দিচ্ছেন। এমনই এক সুমানগঞ্জের প্রেমিক যুগল গত রমজানে অর্না-বুরহান বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। এরপর মেয়ের প্রভাবশালী বাবা ছেলেকে এবং তার পরিবারের লোকদের আসামী করে থানায় অপহরন মামলা দায়ের করে। পুলিশও নারীসহ চারজনকে গ্রেফতার করে। এরপর ওই প্রেমিকার একটি ভিডিও বার্তা ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে অর্না বলে, আমি ১০বছর থেকে বুরহানকে ভালোবাসী, এতে আমার বাবাসহ সবাই আমাকে নির্যাতন সইতে হইছে। আমি সাবালিকা আমার ভালো মন্দ বুঝার জ্ঞান রয়েছে। আমাকে কেউ অপহরণ করেনি, আমি বুরহানকে পালিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য করেছি। যদি আমার শশুর বাড়ির লোকদের হয়রানি বন্ধ না করা হয়, আমরা দুজন আত্মহত্যা করবো। আর এ জন্য দায়ি থাকবেন আমার বাবা, ভাই সহ পুলিশ। এরকম অনেক ভিডিও এবং স্ট্যাটাস ফেসবুকে ভাইরাল হচ্ছে প্রতিদিন।
    সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার এইসব দিনরাত্রি নিয়ে আমাদের জীবন। সব দুঃখ-কষ্টকে সবাই একইভাবে মোকাবেলা করতে পারে না। বর্তমান সময়টাকে বলা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ফেসবুক। আধুনিক জীবনের নতুন এক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে ফেসবুক। তথ্য-উপাত্ত আদান-প্রদান শুধু নয়, পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা, মতামত প্রদানের সহজতর করে দিয়েছে। পাশাপশি মানুষকে দূর থেকে টেনেছে কাছে। অনেক ক্ষেত্রে দুঃখ-কষ্টকে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে পারলে মন হাল্কা হওয়া যায়, তাই বলে সব কিছু সামাজিক মাধ্যমে কেন শেয়ার করতে হবে? নিজের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা ফেসবুকে শেয়ার করে অন্যদের উত্তর বা প্রতিক্রিয়া জানতে গিয়ে অনেকের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে মানসিক চাপ। ফলে অনেকের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। ফেসবুক এখন মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। তবে এর প্রভাব শিশু-কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। 
    রায়হান আহমদ নাহিদ নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থী বলেন, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম হলো ফেসবুক। দিনের একটা সিংহভাগ সময় মানুষ সামাজিকতার উদ্দেশ্যে ফেসবুকের নিউজ ফিডে ঘুরে বেড়ায়। এজন্য সম্পর্কগুলো দ্রুত হয়ে যাচ্ছে। সহজেই একজনের সাথে আরেকজনের পরিচয় ও যোগাযোগ হচ্ছে। অনুভূতিগুলোকে একসাথে সকল বন্ধুদের সাথে শেয়ার যাচ্ছে। 
মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অন্যান্য আসক্তির মতো ফেসবুকে আসক্তিও ভালো নয়। যেমন এ মাধ্যমটি সহজতর তেমনি এর অপব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। একারণে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, একাধিক সম্পর্ক-এসবও বেড়ে যাচ্ছে। 
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের সামাজিক করে তোলার পাশাপাশি অসামাজিকও করে তুলেছে। বাড়ছে সাইবার অপরাধ। 
এ প্রসঙ্গে সিলেট মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার (দক্ষিণ) জুবের আহমদ পিপিএম বলেন, সাইবার অপরাধের ব্যপ্তি দিন দিন বাড়ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুলিশ নগরবাসীকে নানাভাবে সেবা দিচ্ছে। অপরাধ দমন, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং জনসেবা নিশ্চিত করতে এসএমপি পুলিশ বদ্ধপরিকর।
 

Dream Sylhet
ড্রীম সিলেট
ড্রীম সিলেট
এই বিভাগের আরো খবর