শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৪ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

৫৬০

শঙ্কা সুষম উন্নয়নে 

প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০১৯ ১০ ১০ ২৬  

অর্থনীতি ডেস্ক :: বাংলাদেশের সার্বিক সুষম উন্নয়নে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেই উদ্যোগ নেন। বহুমুখী পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বাণিজ্যের আরও প্রসার ঘটিয়ে যাতে শিল্পায়নের প্রসার ঘটে, আপমর জনসাধারণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং দেশব্যাপী সুষম উন্নয়ন হয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতিতে একটি নতুন যুগের উন্মেষ ঘটে।
কিন্তু তা শঙ্কার জালে আবদ্ধ। কারণ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই করা হচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। টেন্ডার ও কার্যাদেশে দেখা যায় ব্যত্যয়। আল-আমিন কনস্ট্রাকশন অধিকাংশ রাস্তা ও সেতু নির্মাণের কাজ করলেও ভিত্তি স্থাপনের পরে ফেলে রেখেছে। গত পাঁচ বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৪১ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক ছাড়াই জুনিয়রদের দিয়ে চলছে তদারকির কাজ।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পপার্ক স্থাপনের জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যান এখানো প্রস্তুত করা হয়নি। সরকারি ১১টির মধ্যে তিনটি অর্থনৈতিক অঞ্চলেরই এ অবস্থা। বাকি ৮টির অবকাঠামো তৈরির কোনো কাজই করা হয়নি।বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্প ১ম পর্যায় (২য় সংশোধন) চলমান প্রকল্পের এই দশা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ- আইএমইডির হালনাগাদ এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ- বেজা।সার্বিক ব্যাপারে জানতে চাইলে বেজার চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী আমার সংবাদকে বলেন, প্রকল্পের কাজ জানতে হলে প্রকল্প পরিচালক- পিডির সঙ্গে কথা বলতে হবে। তিনি সব জানেন। আমি তেমন কিছু জানি না। আপনি প্রতিষ্ঠান প্রধান, তাই কিছু জানতে চাওয়া এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ খুব গভীর পর্যায়ে চলে গেছে। এর পরিধিও বিশাল।মোংলাতে কাজ শেষপর্যায়ে। সবচেয়ে বেশি কাজও হচ্ছে মিরসরাইতে। বিশাল আয়তনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পপার্ক হচ্ছে। তবে বিশ্বব্যাংক বলছে এখনো সেখানে মাস্টারপ্লান হয়নি।এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের কথায় নয়, আমাদের প্রয়োজন এটা। তাই আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। কাজের ধীর অগ্রগতির ব্যাপারে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক আর্থিকভাবে সহায়তা দিচ্ছে। তারা যেভাবে টাকা দেয় সেভাবে কাজ হয়। তাদের টাকা দেয়ায় দেরি হওয়ায় কাজেও দেরি হচ্ছে।বেজা ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্র মতে, সরকার ২০১৪ সালের ৩০ জুনে বিভিন্ন অঞ্চলে বহুমুখী শিল্প স্থাপনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় জমি, অবকাঠমো ও প্রশাসনিক সুবিধার ব্যবস্থা করতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। যা ২০১৪ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সালের জুনে শেষ হবার কথা।অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সুবিধা প্রদানে তথা ওয়ান স্টপ সার্ভিস দেয়ার ব্যবস্থা করতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রথমে ৮২ কোটি টাকা দিয়ে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।প্রথমে চারটি অঞ্চল নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এলাকার পরিধি বাড়িয়ে ১১টি অঞ্চল ও নতুন আইটেম বাড়ার কারণে ব্যয়ও বাড়িয়ে ৯০৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা করা হয়। অপরদিকে দুই বারে সাড়ে চার বছর সময় বাড়ানো হয়।প্রকল্পে অঞ্চল ধরা হয় চট্টগ্রামের মিরসরাই ও আনোয়ারা, কক্সবাজারের টেকনাফ ও জালিয়ার দ্বীপ, ফেনীর সোনাগাজী, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, বাগেরহাটের মোংলা, মৌলভীবাজার সদর, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এবং বন্দর নির্ধারণ করা হয়।এরমধ্যে তিনটির কাজ হচ্ছে। বাকিগুলোর অবকাঠামোর কোনো কাজই শুরু হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় বেজা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এসব অঞ্চলে দেশি-বিদেশি শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিধান রাখা হয়েছে।অনগ্রসর অঞ্চলগুলোকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি তথা দারিদ্র্যবিমোচনের বিষয়কে বিবেচনায় রাখা হয়। ২০২১ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।তাই বাস্তব অবস্থা জানতে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ-আইএমইডি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমএস ডেভলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটসকে চলামান এ প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণের দায়িত্ব দেয়। সরেজমিন পরিদর্শন শেষে প্রতিষ্ঠানটি মে মাসে এর খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ওই প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।সূত্র জানায়, প্রকল্পের প্রধান প্রধান কাজ ধরা হয় ভূমি উন্নয়ন, অফিস ভবন নির্মাণ, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, পানি সরবরাহ ও পয়নিষ্কাশন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও গ্যাস সংযোগ এবং বনায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রম। ২০১৫ সালে প্রথমবার সংশোধন করে ১২২ কোটি টাকা করা হয়।পরের বছর ২য় বার সংশোধন করে ব্যয় ৯০৫ কোটি টাকায় বাড়ানো হয়। একইসঙ্গে পরিধিও বাড়িয়ে ১১টি অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পরে ৪টি অঞ্চলে অর্থাৎ সোনাগাজীতে ২টি, মিরসরাইতে একটি ও মোংলাতে বড় আকারে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।কয়েকটি কারণে স্থানের গরমিল হয়েছে বলে প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান। ফলে উদ্দেশ্যের সাথে অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়েছে। কারণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমভাবে উন্নয়নকে নিশ্চিত করারই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিলো। বেজা এ ব্যাপারে অবগত। তাই নিজস্ব অর্থায়নে বাকি স্থানগুলোতে ভূমি উন্নয়নসহ অন্যান্য কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।প্রতিবেদন সূত্র জানায়, হবিগঞ্জের শ্রীহট্ট শিল্পাঞ্চল অত্যন্ত সুবিধাজনক হলেও চা শ্রমিকদের প্রবল বাধা ও আন্দোলনের মুখে জমি অধিগ্রহণ করতে না পারায় বেজাকে সরে আসতে হয় এ স্থান থেকে। এছাড়া টেকনাফে পর্যটনসংক্রান্ত কোনো প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক নীতিগতভাবে সাহায্য করবে না বলে জানায়।বাকি ৭টি প্রকল্পে খাস জমি না পাওয়া এবং জনসাধারণের জমি অধিগ্রহণে বিশ্বব্যাংকের নীতিগত আপত্তি। এমন পরিস্থিতিতে একমাত্র বিকল্প মোংলা ও মিরসরাই। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকও আপত্তি করেনি। বরং দেড় হাজার একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ থাকায় বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দিয়েছে।তাই মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের মাধ্যমে ফেনীর সোনাগাজী, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সীতাকুন্ড এলাকায় ৩০ হাজার একর জমিতে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য স্থির করা হয়।তা আমলে নিয়ে সোনাগাজী, মিরসরাই ও মোংলাতে বড় আকারে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন কাজের বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মোংলায় ২০৫ একর ভূমি উন্নয়ন শেষ হয়েছে।সোনাগাজী ও মিরসরাইতেও প্রায় ২ হাজার একর ভূমির উন্নয়ন কাজ চলামান। প্রকল্পের মূল অঙ্গ মাটি ভরাট ও ড্রেজিংয়ের কাজে নিয়োজিত চাইনিজ কোম্পানির কাজ সন্তোষজনক। সমুদ্র থেকে ড্রেজিং, মাটি ভরাট ও সুপার ডাইক নির্মাণ কাজের অগ্রগতিও সন্তোষজনক। তা সিডিউল অনুযায়ী হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকসহ প্রকল্প অফিস সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে।তবে রাস্তা ও ভবন নির্মাণে অনেক পিছিয়ে। আল-আমিন কনস্ট্রাকশন নামে একটি কোম্পানি প্রায় অধিকাংশ রাস্তা ও সেতু নির্মাণের প্যাকেজের কাজ করছে। তারা একটি কাজ শেষ করার আগেই আরেকটি কাজ করছে। বেশ কয়েকটি সেতুর মূল ভিত্তি স্থাপনের কাজ শেষ করে ফেলে রেখেছে।এজন্য তাদের কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক হচ্ছে না। দুবার প্রকল্প সংশোধন করে আয়তন ব্যাপকভাবে বাড়ানো হলেও সে অনুযায়ী লোকবল বাড়ানো হয়নি। এ অঞ্চলটি ঘিরে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।সাম্প্রতিক সময়ে তারা অসন্তুষ্টিও প্রকাশ করছেন। কারণ তারা এসব এলাকায় আগে পশুপালন ও মাছ সংগ্রহ করলেও বর্তমানে সে সুযোগ নেই। অপরদিকে শিল্প স্থাপন প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় নতুনভাবে কর্মসংস্থানও হচ্ছে না।প্রকল্পের মূল অঞ্চল মিরসরাই বন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় রপ্তানি বাণিজ্যের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পের বিকাশেরও সুযোগ হবে।তবে মিরসরাই স্থানটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যথা— সুনামী, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের মতো মারাত্মক ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত। জিওলোজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের গবেষণা অনুযায়ী মিরসরাই সবচেয়ে মারাত্মক সুনামি ঝুঁকি অঞ্চলে অবস্থিত। অপরদিকে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা অনেক কম।এটি বিনিয়োগের ও কর্মসংস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলেও প্রকৃতপক্ষে মূল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও স্টেকহোল্ডার অ্যানালাইসিস করা হয়নি। তবে বিশ্বব্যাংক থেকে প্রকল্পটির অ্যাপ্রাইজাল করা হয়েছে। বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থাও অপ্রতুল।তাই প্রাকৃতিক বা অন্য কারণে প্রকল্প এলাকার সাথে দেশের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করে তা মোকাবিলায় সঠিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অপরদিকে মোংলাতে এ প্রকল্পের আওতায় মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বরাদ্দ খুবই কম, মাত্র ৫২ কোটি টাকা।আগামী বছরে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে ৪১ শতাংশ। এরমধ্যে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় অগ্রগতি ২৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। ভূমি উন্নয়ন হয়েছে ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ, বিদ্যুৎ সরবরাহ ৫৮ দশমিক ৩২ শতাংশ. রাস্তা ও মহাসড়ক নির্মাণ ২৪ দশমিক ৮১ শতাংশ, সেতু নির্মাণ ৬৭ দশমিক ২৩ শতাংশ, পানি সরবরাহ ৮৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।মূল পরিকল্পনায় ১১টি অর্থনৈতিক অঞ্চল ধরা হলেও ৪টি অঞ্চলের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কাছেও নিয়মিত টেস্ট রিপোর্ট দিতে হয় তাদের। বুয়েট ও চুয়েট থেকে প্রয়োজনে টেস্ট করা হচ্ছে। রিপোর্ট না পেলে অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদারের বিল দেয়া হচ্ছে না।সরকারি এজি অফিস ও বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকেও নিয়মিত অডিট করা হচ্ছে। এসব কারণে কাজের গুণগতমান ভালো হচ্ছে।প্রকল্পটি সংশোধন করে এলাকা বাড়ানো হলেও লোকবল তেমন নেই। প্রকল্প পরিচালক পদটি অনেক দিন থেকে শূন্য রয়েছে।সহকারী প্রকল্প পরিচালক পদেও নেই লোক। মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী প্রকৌশলী পদেও কাউকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও আইটি বিশেষজ্ঞদেরও নিয়োগ দেয়া হয়নি। জুনিয়রদের দিয়েই চলছে তদারকি কাজ।বিভিন্ন কাজের ব্যত্যয় : ফিজিবিলিটি স্টাডি- সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই করা হচ্ছে প্রকল্পের কাজ। মূল বা সংশোধিত ডিপিপিতে বিস্তারিত ইকোনোমিক ও ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস করা হয়নি। সংশোধন করা হলেও ১১টি স্থানের অবস্থান, ম্যাপ বা পরিকল্পনার কোনো বিশদ ব্যাখা নেই।ফলে অনেক কিছু আমলে নেয়া হয়নি। আল-আমিন কনস্ট্রাকশন অধিকাংশ রাস্তা ও সেতু নির্মাণের কাজ করায় সেতুর ভিত্তি স্থাপনের পর ফেলে রাখা হয়েছে। খুব ধীরগতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ কারণে জনগণ এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সাগরপাড়ে গাছ কাটার ফলে হরিণ, পশুপাখির আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। ফলে এলাকার পরিবেশ ও জীবনমানের ওপর কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।অপরদিকে, সংশোধন করে ১১টি এলাকার মধ্যে মাত্র ৪টি এলাকায় কাজ হচ্ছে। যা প্রকল্পের প্রথম উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। কারণ প্রথমে বলা হয়েছে— দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমভাবে উন্নয়নকে নিশ্চিত করা হবে। শুধু তাই নয়, ১১টি অঞ্চলে প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার একর ভূমি উন্নয়নের কথা থাকলেও বাস্তবে ৪টি এলাকায় মাত্র ১ হাজার ৬০৫ একর এলাকায় কাজ করা হচ্ছে।কাজের ব্যাপারে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই যথাযথ ছিলো না বলেই এ অবস্থা। একইসঙ্গে টেন্ডার ও কার্যাদেশের মধ্যেও ব্যত্যয় ঘটেছে। কারণ পিপিআর অনুযায়ী ১২০ দিনের মধ্যে টেন্ডার ও কার্যাদেশ দেবার বিধান থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় দেখা যায়।শিল্পের তরল বর্জ্য পরিশোধনে সিইটিপির প্রয়োজন হলেও এ প্রকল্পে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পপার্ক স্থাপনের জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যান এখানো প্রস্তুত করা হয়নি।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এতো কিছুর পরও প্রকল্পের সুযোগ সুবিধার ব্যাপারে ৪৭ শতাংশ মানুষ বলছেন, এটি বাস্তবায়ন হলে জীবনমান উন্নত হবে। ৩৭ শতাংশ বলছেন, কর্মসংস্থান হবে। প্রায় ৩০ শতাংশ বলেন আয় বাড়বে। ১০ শতাংশ জানান বেকারত্ব কমবে, ৯ শতাংশ মনে করেন যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হবে।কেউ কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেনি এ প্রকল্প নিয়ে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মূল কাঠামো নির্মাণ শেষে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব-পিপিপি মডেলে এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হবে। ভূমি উন্নয়ন শেষে মোংলায় এ ধরনের একটি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে এ অঞ্চলটি ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়াভুক্ত হওয়ায় এলাকার তুলনায় বিনিয়োগ আশানুরূপ না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।প্রকল্পটি সার্থক করতে তাই আইএমইডি থেকে কিছু ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে— প্রকল্পের এলাকা, এর আয়তন ও প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের সাথে সমন্বয় এবং ফিজিবিলিটি স্টাডি করে ভালোভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ। মিরসরাই অঞ্চলে বড় আকারের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পপার্ক স্থাপনে প্রস্তাবিত মাস্টার প্লানটির কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। দেশে সুষম উন্নয়নে সব এলাকায় সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য যোগাযোগ ও প্রচারের পাশাপাশি স্টেকহোল্ডার অ্যানালাইসিস যথাযথভাবে করতে হবে। অরগানোগ্রাম অনুযায়ী শূন্য পদে লোকবল নিয়োগ করে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও সুযোগ বাড়াতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পর টেকসই পরিকল্পনা করতে হবে বলে সুপারিশ করা হয়েছে নিবিড় পরিবীক্ষণে।উল্লেখ্য, ২০১০ সালের আগস্টে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন পাস হয়। ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম পরিচালনা পরিষদের বৈঠক। অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কাজ শেষ করতে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প (পর্যায়-২)’ শীর্ষক একটি প্রকল্পও হাতে নেয় সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেজা পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান।বেজা সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি মিলে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। এরই অংশবিশেষ ২০১৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি পর্যায়ে ৪টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া সম্প্রতি কয়েকটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।বেজার আওতাধীন নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন, মৌলভীবাজারের শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল, নারায়ণগঞ্জের সিটি ইকোনমিক জোন, সিরাজগঞ্জ ইকোনমিক জোন এবং মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় আব্দুল মোনেম অর্থনৈতিক অঞ্চলের উদ্বোধন করেন। তাতে ব্যাপক সাড়াও মিলছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে এরই মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে চীন, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ।

 

Dream Sylhet
ড্রীম সিলেট
ড্রীম সিলেট
এই বিভাগের আরো খবর