বুধবার   ২৪ জুলাই ২০১৯   শ্রাবণ ৮ ১৪২৬   ২১ জ্বিলকদ ১৪৪০

২৪৩

যোগাযোগ সংকটে অপূরনীয় আর্থিক ক্ষতির মুখে গোটা সিলেট

প্রকাশিত: ২৪ জুন ২০১৯ ১৪ ০২ ১৮  

ফয়সাল আমীন::  সারাদেশের সাথে অপ্রত্যাশিত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সিলেট। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শাহবাজপুর সেতু দিয়ে যানচলাচলা বন্ধ হওয়ার এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ১০দিন পর্যন্ত থাকবে একই অবস্থা।  এতে করে হুমকি মুখে পড়েছে সামগ্রিক আর্থিক খাত। যাত্রীদের বিড়ম্বনা অন্তহীন। বিদেশগামী যাত্রীদের দূর্দশা চরমে। পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্থ হ্ওয়ায় বাজারে বিরাজ করছে নেতিবাচক প্রভাব । সড়ক পথে কুরিয়ার সার্ভিসের পথও রুদ্ধ। জরুরী অবস্থায় মোকাবেলায় বিকল্প কোন উদ্যোগ গ্রহন হয়নি। রেলপথে প্রচন্ড চাপ। সামাল দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। আকাশ পথ সংর্কীণ। সন্ধ্যাকালীন ফাইট এর ব্যবস্থা নিলেও স্টাফ সংকট দেখিয়ে তাও থমকে দেয়া হয়েছে। অভাবনীয় লোকসানের মুখে পড়ে সিলেট-ঢাকা রোডে চলাচলরত আন্ত:জেলা বাসগুলো দাঁড়িয়ে আছে সিলেটের মাঠিতে। পণ্যবাহী ট্রাকের চাকাও বন্ধ। রাস্তায় পচে ক্ষতি হচ্ছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের সবজি, মৌসূমী ফসল সহ কাঁচামাল। সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি: এর সাবেক সভাপতি খন্দকার শিপার আহমদ বলেন, সংকট মোকাবেলায়  একটি বাড়তি  ট্রেন এর ব্যবস্থা করতে পারতেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় অপূরণীয় ক্ষতির মুখে প্রবাসী অধ্যূষিত সিলেট। সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক বলেন, সেতু  পারপারে বিকল্প সুযোগ সৃষ্টি রাখা হয়নি, ঝুকি পূর্ণ সেতৃ নিয়ে কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন নিবেদন করেছি আমরা। তারপরও তারা পূর্ব কোন প্রস্তুতি নেয়নি। সড়ক পথে অতিরিক্ত লোডবাহী ট্রাক চলাচলা নিত্য ঘটনা, সেই অবৈধ চলাচল বন্ধে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সেকারনে আজ সমগ্র সিলেট স্তব্ধ। সামগ্রিক ব্যবস্থায় ভাটা পড়েছে। অনিশ্চতায় পড়েছে আর্থিক খাত। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার। তাদের ঘরে খাদ্যভাবে দেখা দিয়েছে। জ্বালানী খাতেও মন্দাভাব। চিকিৎসাখাতে বিরাজ করছে একই অবস্থা। ঔষধ সহ অক্সিজেন সিলিন্ডার পরিবহন, গ্যাস সিলিন্ডার সরবারাহ বন্ধ হওয়ায় সংকট তীব্র হচ্ছে। নির্মাণ সামগ্রি নিয়ে শংকা। সিলেট থেকে পাথর বালু দেশব্যাপী সরবারাহ হয়। সেকারনে  সেই খাতেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন ৭০০/৮০০ যাত্রীবাহী গাড়ি সিলেট-ঢাকা রোডে যাতায়াত করে। গাড়িগুলোর সাথে জড়িয়ে রয়েছে লাখ মানুষের স্বার্থ। কিন্তু সব কিছুই এখন অন্ধকারে। সংশ্লিষ্টরা পূর্ব প্রস্তুতি না নেয়ায় সামগ্রিক দূর্ভোগে ফুটে উঠছে নাগরিক সেবাহীন মানসিকতার বাস্তবতা। চাপা ক্ষোভে ফুঁসে রয়েছে ভোগান্তির শিকার মানুষ। আবহ্ওায়া ্ও বাস্তবতার প্রতিকূল চিত্রের শেষ কোথায় তা নিয়ে অজানা শংকা বিদ্যমান হচ্ছে মানুষের মধ্যে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শাহবাজপুর সেতু দিয়ে যান চলাচল বন্ধের কারনেই নেমে এসেছে যোগাযোগ সংকট। বিকল্প হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর-সরাইল ও হবিগঞ্জের লাখাই-হবিগঞ্জ-শায়েস্তাগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক ব্যবহার করার সুযোগ থাকলেও সড়কটি সরু হওয়ায় লেগে রয়েছে দীর্ঘ যানজট। এই যানজট অতিক্রম করে পূর্বেও সময়ের চেয়ে দ্বিগুন সময় পেরিয়ে গেলেও পৌঁছানো যাচ্ছে না গন্তব্যে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রেনের টিকেটও মিলছে না। ঢাকা-সিলেট রুটে চলাচল করা কোম্পানীর বাস বাধ্য হয়ে বন্ধ রাখায় বেড়ে গেছে ট্রেন টিকেটের ব্যাপক চাহিদা। তাই রেলস্টেশনে গিয়েও যাত্রীরা পাচ্ছেন না ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হওয়া ট্রেনের টিকেট। এমন পরিস্থিতিতে চরম বিপাকে পড়েছেন যাত্রীরা।
শুক্রবার রাত ১০টায় সিলেট থেকে রওয়ানা দিয়েছিলো শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস। শনিবার বিকাল চারটায় ওই বাসটি ভৈরব এলাকার কাছাকাছি পৌঁছে। বিকল্প সড়কটি সরু হওয়ায় যানজটে পড়ে র্দীঘ ১৮ ঘন্টায় বাসের যাত্রীদের ঢাকা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাই শনিবার থেকে শ্যামলী পরিবহনের সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানান শ্যামলি পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার টিপু দাস। 
শ্যামলী পরিবহনের মত সিলেট থেকে সারা দেশে বাস যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে গ্রীন লাইন পরিবহন, লন্ডন এক্সপ্রেস, ইউনিক সার্ভিস, এনা ট্রান্সপোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড, হানিফ পরিবহনসহ বেশিরভাগ দূরপাল্লার বাস। 
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে শাহবাজপুর সেতুর চতুর্থ স্প্যানের ফুটপাতসহ রেলিং ভেঙে পড়ায় গত ১৯ জুন ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেয় সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ)। পাশাপাশি সড়ক ও জনপদ বিভাগের পক্ষ থেকে বিকল্প সড়ক হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর-সরাইল ও হবিগঞ্জের লাখাই-হবিগঞ্জ-শায়েস্তাগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক ব্যবহার করতে বলা হয়। 
এই বিকল্প সড়কটিও বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। চারদিন যাবত ভারী যানবাহন চলাচল করায় ইতোমধ্যে এই বিকল্প সড়কে বিভিন্ন জায়গায় গর্ত সৃষ্টি হয়ে গেছে। তাছাড়া এই সড়কটি আকারে সরু হওয়ায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত যানজট থাকে। যার ফলে বাস সার্ভিস বন্ধ রাখা হয়েছে। 
এদিকে সিলেটের থেকে সারাদেশের সাথে বাস যোগাযোগ বন্ধ রাখায় দূর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে বিদেশগামী যাত্রী, অসুস্থ যাত্রী, চাকুরীজীবী ও পর্যটকরা বেশি বিপাকে পড়েছেন। প্রতিদিনই যাত্রীরা কাউন্টারে এসে ভিড় করছেন।
সিলেটের কদমতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, বাস সার্ভিস বন্ধ থাকলেও বাস টার্মিনালে প্রচন্ড ভিড়। দরগা গেইট এলাকায় বিভিন্ন বাস কাউন্টারেও যাত্রীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় ভিড় বেড়েছে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে। শনিবার সকাল থেকেই টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন চোখে পরে। ট্রেনের টিকিট না পেলেও প্লাটফর্মেই সময় কাটান যাত্রীরা।
গ্রীন লাইন পরিবহনের দরগা গেইটস্থ কাউন্টারে ঢাকা যাওয়ার জন্য টিকেট নিতে আসেন মুহাইমিন রহমান। তিনি বলেন, মাকে ডাক্তার দেখাতে ঢাকা যাবো, কিন্তু কোনো বাসের টিকেট পাচ্ছি না। সব বাস বন্ধ। আর ট্রেনের টিকেট তো সোনার হরিণের মত। শুনেছি ৩৫০ টাকার টিকেট ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।১৯ তারিখ ট্রেনে করে বন্ধুদের নিয়ে সিলেটে বেড়াতে এসেছিলেন সোয়েব। বাস বন্ধ থাকার কারণে যেতে পারছেন না ঢাকায়। তিনি বলেন, আমরা ৫ বন্ধু এসেছিলাম ঘুরতে। আজ ঢাকা যাওয়ার কথা আমাদের। কিন্তু সব বাস বন্ধ। স্টেশনে গিয়ে ট্রেনের টিকেটও পাই নাই। বুঝতেছি না কি করবো। কারণ আমরা কলেজ ছাত্র। লিমিটেড খরচ নিয়ে এসেছি। এখন সিলেটে থাকতে গেলে কিছুটা বিপাকে পড়তে হবে।
শনিবার থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে শ্যামলী পরিবহনের বাস। গত তিন দিন যাবত বন্ধ রাখা হয়েছে ইউনিক সার্ভিসের বাস, ১৯ তারিখ রাত ১১টার পর থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে লন্ডন এক্সেপ্রেস ও এনা ট্রান্সপোর্টের বাস, ১৮ তারিখ থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে গ্রীন লাইন পরিবহনের বাস। ব্রীজ মেরামত হওয়ার পর অথবা বেইলি ব্রীজ বা ফেরির ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত বাস সার্ভিস বন্ধ রাখা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বাস সার্ভিস বন্ধ রাখার কারণে কোম্পানীগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান কাউন্টারে দায়িত্বরতরা। ঢাকা-সিলেট রুটের মত এমন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সেতু ভাঙার পর দায়িত্বশীলদের উদাসীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।
গ্রীন লাইন পরিবহনের সেলস অফিসার মো. মহিউদ্দিন বাবু বলেন, যে বিকল্প সড়কে চলাচলের জন্য বলা হয়েছে সেটা ভারী যানবাহন চলাচলের জন্য উপযোগী না। তাই এই বিকল্প সড়কে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার যানজট থাকে। বাস বন্ধ রাখার জন্য কোস্পানীর প্রতিদিন প্রায় ৩ লক্ষ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। আর যাত্রীদের দূর্ভোগতো চরমে। বাস বন্ধ করার পর থেকে প্রতিদিন যাত্রীরা টিকেটের জন্য আসেন। অনেকে রোগী নিয়ে আসেন। তখন খুব খারাপ লাগে। আমরাতো কাউন্টার বন্ধ করে দিতাম। কিন্তু যাত্রীদের কথা চিন্তা করে শুধুমাত্র ইনফরমেশন দেওয়ার জন্য কাউন্টার খুলে রাখছি।
এনা ট্রান্সপোর্ট প্রাইভেট লিমিটেডের মাজার গেইটের কাউন্টার মাস্টার দিপু বলেন, ব্রিজ ভাঙার দিন থেকেই আমাদের এই রুটের বাসগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। ব্রিজ ঠিক হওয়ার পরই আবার সার্ভিস শুরু হবে।
ইউনিক সার্ভিসের কাউন্টার মাস্টার মাহবুব রহমান বলেন, এভাবে বাস সার্ভিস বন্ধ রাখার জন্য যাত্রীদের যেমন দূর্ভোগ হচ্ছে। তেমনি আমাদেরও ক্ষতি হচ্ছে। আর যে বিকল্প সড়ক ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে সেটা ব্যবহারের উপযোগী না। এখন ব্রিজ ঠিক হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। অথবা সংশ্লিষ্টদের বিকল্প পথ বের করে দিতে হবে। যেমন ওই সেতুর পাশে বেইলি ব্রীজ অথবা ফেরীর ব্যবস্থা করতে হবে।
লন্ডন এক্সপ্রেসের কাউন্টার ম্যানেজার শাকির বলেন, ব্রিজ ভাঙার কারণে চারদিন যাবত আমাদের বাস সার্ভিস বন্ধ। বিকল্প সড়ক ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু ওই সড়কের যে অবস্থা সেটা দিয়ে আমাদের পরিবহনের মত ভারী যানবাহন নিয়ে চলাচল সম্ভব না। বাস বন্ধ রাখার কারণে কোম্পানির ক্ষতি হচ্ছে। স্টাফরাও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আর যাত্রীরাতো চরম ভোগান্তির মধ্যে আছেন। এদিকে, সড়ক ও জনপথের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সেতু মেরামত করতে আরও ১০ দিনের মতো সময় লাগতে পারে। তাই এই ১০ দিনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ভারী যানবাহন চলাচল সম্ভব হবে না। তবে, এ সমস্যা থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে তিতাস নদীতে ফেরি চালু করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। সড়ক ও জনপদ সুত্র জানিয়েছে- ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে শাহবাজপুরে তিতাস নদীর সেতু এলাকায় ফেরিতে যানবাহন উঠার জন্য এপ্রোচ এবং ঘাট নেই। এপ্রোচ এবং ঘাট তৈরির কাজও শুরু করেছেন তারা। একই সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে একটি ফেরি ইতিমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে তিতাস নদীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে।
সিলেট বিভাগ গণদাবী পরিষদের সভাপতি এডভোকেট আতাউর রহমান চৌধুরী আজাদ বলেন,  সেতু ভেঙ্গে একদিনে তো পড়েনি। দীর্ঘদিন থেকে ৬ লেনের দাবী তোলছি আমরা। অর্থনৈতিক বিবেচনায় সিলেটের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সেই সিলেটের সাথে বিমাতাসুলভ আচরনে বহি:প্রকাশ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায় ফুটে উঠছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নে পূর্ব ঝুঁকি থাকার র্পও কোন প্রস্তুতি না নেয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা দাবী করেন এডভোকেট আজাদ। 
        এব্যাপারে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আল মামুন জানান- ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও কমপক্ষে ১০ দিন সময় লাগবে। পাশাপাশি বিকল্প হিসাবে ফেরি ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২/১ দিনের মধ্যে একটি ফেরি কার্যক্রম শুরু করবে।
 

Dream Sylhet
ড্রীম সিলেট
ড্রীম সিলেট
এই বিভাগের আরো খবর