শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৪ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

১৫৩

ভারতে মুসলিমবিরোধী সাম্প্রদায়িকতার সমালোচনায় যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশিত: ৪ জুলাই ২০১৯ ১৪ ০২ ৫২  

সম্প্রতি ভারত সফরে এসে দেশটিতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর নির্যাতন ও সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও। তিনি বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে আপস করা মানে বিশ্বকে খারাপ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেয়া পম্পেওর এই বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

কারণ এর সপ্তাহখানেক আগে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা শীর্ষক রিপোর্টে বলা হয়, ভারতে বিশেষত মুসলমানরা চরমপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গরুর মাংস খাওয়া ও রাখা নিয়েও হিংসার শিকার হতে হচ্ছে তাদের। এই পরিস্থিতিতে ভারতের অন্যতম বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিবের এই বার্তা হালকা করে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।

কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরই ভারতে মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক ঘটনা বেড়ে যায় ব্যাপকভাবে। প্রথম বার বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর পরই পত্র-পত্রিকায় সংবাদ বেরিয়েছিল এক মুসলমান যুবককে গাছের সাথে বেঁধে বেদম পেটানো হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে বিজেপি নেতা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় পর ভারতে সরকার সমর্থকদের এ অনাচার-অত্যাচার বেড়ে গেছে আরও বহুগুণে। এ ধরনের অন্যায় আচরণের জন্য তাদের নেতৃবৃন্দ যদি দুঃখ প্রকাশ করতেন, তা হলেও কথা ছিল। বলা যেতো এককালের বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে সুপরিচিত ভারতের এককালের ঐতিহ্য কিছুটা হলেও অবশিষ্ট রয়েছে তার মধ্যে।

কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না, বিজেপি নেতাদের নিজেদের বক্তব্যের কারণেই। বিজেপি নেতৃবৃন্দ দাবি করেছেন, ‘ভারতে আমরা (অর্থাৎ হিন্দুরা) সংখ্যাগরিষ্ঠ, আমরা যা বলব, তাই হবে।’ এভাবেই তারা বলেছেন, মুসলমানরা সংখ্যালঘিষ্ঠ এবং হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সুতরাং হিন্দুরা যা বলবে, সেটাই হতে হবে। হিন্দুরা যদি বলেন, গরু জবেহ করা চলবে না, গরুর গোশত বেচা কেনা চলবে না, তবে তা বন্ধ করতে হবে।

বাহ্যিকভাবে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা মোতাবেক দেশ চালনার এই মনোভাব বুঝি গণতন্ত্রের সহায়ক। কিন্তু আদপেই কি তাই? শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন হলেই কি তা গণতন্ত্র হয়ে যায়? সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দল বা সম্প্রদায়ের শাসন যদি সংখ্যালঘিষ্ঠ দল বা সম্প্রদায়ের মানবাধিকার ক্ষুন্ন করে, তবুও কি তাকে গণতন্ত্র বলা যাবে? অবশ্যই না।

যে কোনো মানুষের মধ্যে একাধিক সত্তা থাকতে পারে। ধর্ম, ভাষা, বর্ণ, বংশ, দেশ, রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রভৃতি নানাভাবে তাদের মধ্যে বিভক্তি আসতে পারে। আবার এ বিভক্তি যে একবার তাদের মধ্যে সারা জীবনের জন্য থাকবে তা-ও সত্য নয়। এর মধ্যে কেবল বর্ণ ও বংশ অপরিবর্তনীয়। ধর্ম, দেশ, রাজনৈতিক বিশ্বাসসহ বাকী সবগুলি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ইচ্ছা মোতাবেক পরিবর্তনশীল। এসব পরিবর্তন আমাদের চোখের সামনে এত অধিক ঘটছে, এর সত্যতা ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এক অবান্তর ব্যাপার হিসাবে গণ্য হতে বাধ্য।

গণতন্ত্র মানুষের মধ্যে এসব পরিবর্তনকে বাস্তব বলে মেনে নেয় বলে পৃথিবীতে গণতন্ত্রকে সব চাইতে বাস্তববাদী রাজনৈতিক মতবাদ বলে স্বীকৃতি দান করা হয়েছে। এর স্বপক্ষে দৃষ্টান্ত হিসেবে এককালের সোভিয়েত ইউনিয়নের নাম উল্লেখ করা যায়। সে দেশে এককালে কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া আর কোনো দলের অস্তিত্ব কল্পনা করা যেত না। অথচ আজ সেখানে একাধিক রাজনৈতিক দল কাজ করছে। পূর্ব ইউরোপের এককালের কমিউনিস্ট দেশসমূহ এবং চীন, কিউবা, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশের নামও এ প্রসঙ্গে উল্লেখের দাবিদার।

একেবারে ঘরের দেশ বাংলাদেশের কথাই বা আমরা ভুলে যাই কী করে? ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত এই দেশ ছিল তদানীন্তন পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশ স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের অবিসম্বাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পাকিস্তানের জেলে বন্দি। তাঁর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধকালে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

মুক্তিযুদ্ধ কালে ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক সাহায্য দান করে। সে সময় ভারতের এই সাহায্য মুক্তিযুদ্ধে আমাদের চূড়ান্ত বিজয়ে সহায়ক বলে বিবেচিত হলেও এতে ভারতেরও কম স্বার্থ ছিল না। এই সাহায্যের মাধ্যমে ভারত বৃহত্তর রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে পূর্ববঙ্গকে দুর্বল বাংলাদেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল এবং এই লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের শেষেও বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনীর একটি অংশ রেখে দিয়েছিল।

কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম সেনানী শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের এ কুমতলবকে সমর্থন করেন কী করে? মুক্তিযুদ্ধ শেষে তিনি পাকিস্তান থেকে প্রথমে লন্ডনে গিয়ে ভারতের এ কুমতলব বিষয়ে অবগত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে এ ব্যাপারে তাঁর ইতিকর্তব্যও ঠিক করে ফেলেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে লন্ডন থেকে বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তনকালে দিল্লীতে স্বল্প বিরতিকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে সরাসরি প্রশ্ন করে বসেন- ম্যাডাম, আপনি বাংলাদেশ থেকে আপনার বাহিনী কখন ফেরৎ আনবেন? ইন্দিরা গান্ধী জবাবে বললেন, আপনি যখন বলবেন, তখনি। বঙ্গবন্ধুর তখন বিশ্বব্যাপী যে জনপ্রিয়তা, তাতে ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষে অন্য কোনো জবাব দেয়া সম্ভব ছিল না। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনীর অপসারণ বাস্তবে সহজ হয়ে ওঠে।

আমরা আজকের এই লেখা শুরু করেছিলাম ভারতে মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক কর্মকান্ড নিয়ে। ভারতের ইতিহাসে এটা কোনো নতুন ব্যাপার নয়। অবিভক্ত ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংখ্যালঘু মুসলমানদের জন্য বৃহত্তর বিপদ ডেকে আনতে পারে এই আশঙ্কাই ১৯৪০ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক লাহোর অধিবেশনে অবিভক্ত ভারতবর্ষের উত্তর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাসমূহকে নিয়ে পাকিস্তান নামক স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয় শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের উত্থাপিত প্রস্তাবক্রমে। পরবর্তীকালে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সকল তরুণ ও প্রবীণ নেতৃবৃন্দ। সেদিনের পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর কেন্দ্রীয় রাজধানী, সেনা বাহিনী, নৌবাহিনী ও এয়ার ফোর্সসহ সমগ্র প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তর পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত হওয়ায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের যাত্রা শুরুই হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অবহেলার মধ্যদিয়ে।

এসব অবহেলা-অব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্ত¡শাসন আন্দোলন প্রভৃতির মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে যে স্বাধিকার চেতনা সৃষ্টি হয় তা পশু বলে ধ্বংস করে দিতে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর অবাঙ্গালী নেতৃবৃন্দ চেষ্টা চালালে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ জীবন-মরণ পণ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে মাত্র নয় মাসের মধ্যে তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

সুতরাং দেখা যায়, আজকের এ স্বাধীন বাংলাদেশ কারো দয়ার দান নয়, যেমনটা ভারত বুঝাতে চায়। এর পেছনে পলাশীতে আমাদের স্বাধীনতা হারানোর পর প্রথমে একশত বছর যুদ্ধ, পরে সিপাহী বিপ্লবের ব্যর্থতার পর আরো একশত বছর চলে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং সর্বশেষে ১৯৭১ সালে পুনরায় নয় মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ফসল এই স্বাধীন বাংলাদেশ। যে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রথম একশ বছর সশস্ত্র লড়াই করে দীর্ঘ দিন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সর্বশেষে পুনরায় দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ আমাদের চালাতে হয়েছে, তাকে রক্ষা ও শক্তিশালী করতে আমাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে সদা প্রস্তুত থাকাই আজ আমাদের পবিত্রতম কর্তব্য। এ কর্তব্য কর্মে সামান্যতম অবহেলা গণ্য হবে বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র সত্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের শামিল।

Dream Sylhet
ড্রীম সিলেট
ড্রীম সিলেট
এই বিভাগের আরো খবর