সোমবার   ২৬ আগস্ট ২০১৯   ভাদ্র ১০ ১৪২৬   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

১৬৯

ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: পাশবিকতার শেষ কোথায়

আহমদ মারুফ 

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৯ ১৮ ০৬ ২০  

শিশু-কিশোরদের ওপর নিষ্ঠুরতা যেন থামছেই না। দিন দিন তা আরো বেড়ে যাচ্ছে। মানুষ কতটা নিষ্ঠুর, ভয়াবহ আর পশুবৃত্তিক হলে এমনটা করতে পারে তা ভাবলেও শরীর শিউরে উঠে। ব্যক্তিগত আক্রোশ-প্রতিহিংসা, পারিবারিক কলহের জের ও ছোটখাটো ‘অপরাধে’ নৃশংসতার শিকার হচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে এ ধরনের নির্মম নিষ্ঠুরতা। একের পর এক পাশবিক ঘটনায় হতবাক বিবেকবান মানুষ। এ যেন মানবিকতার চরম বিপর্যয়। 

একের পর এক শিশু ধর্ষণের ঘটনা পত্রপত্রিকায় উঠে আসছে। এমন সব ঘটনা ঘটছে- যেন তা আদিম বর্বরতাকেও হার মানাচ্ছে। মানুষ কতটা নিষ্ঠুর, ভয়াবহ আর পশুবৃত্তিক হলে এমনটা করতে পারে তা ভাবলেও শরীর শিউরে উঠে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে এ ধরনের নির্মম নিষ্ঠুরতা। একের পর এক পাশবিক ঘটনায় হতবাক বিবেকবান মানুষ। এ যেন মানবিকতার চরম বিপর্যয়। বিকৃত মস্তিষ্কের চূড়ান্ত পরিণতি।
এক সপ্তাহ ধরে দেশে শিশু নির্যাতনের চিত্র যে কতটা ভয়াবহ এবং কতোভাবে যে শিশুরা নির্যাতিত হচ্ছেÑকয়েকটি সংবাদপত্রের শিরোনাম পাঠক চেতনায় শিহরণ জাগানোর কথা। ‘ওয়ারীতে সাত বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা’, ‘সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ ছাত্রীকে ধর্ষণ: শিক্ষকের স্বীকারোক্তি’, ‘ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে গণধোলাই’, ‘নবীনগরে শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ’, ‘পটুয়াখালীতে মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, আরও চার জেলায় এক স্কুলছাত্রী, দুই শিশু ও বাক্‌প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণের শিকার’, ‘বিয়ের জন্য ডেকে নিয়ে ধর্ষণ’Ñশিরোনাম দেখে খবরের বিস্তারিত পড়লে শিউরে উঠতে হয়। বিশেষ করে ওয়ারীতে সাত বছরের মেয়ে সায়মাকে ধর্ষণের পর হত্যার যে ঘটনাটি ঘটছে, তা আমাদেরও স্তম্ভিত করেছে।
শিশু নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৩ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে সুটকেসের ভেতরে থাকা একটি ৯ বছরের ছেলে শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার বুকে ও কপালে ছ্যাঁকার দাগ আর পিঠে গভীর জখমের চিহ্ন ছিল। এরপরের দিন শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটল আরেকটি। অভাবের তাড়নায় স্কুলের পড়া ছেড়ে গ্যারেজে কাজ নিয়েছিল ১২ বছরের শিশু রাকিব হাওলাদার। শিশু রাকিবকে গ্যারেজ মালিক মোটর সাইকেলের চাকায় হাওয়া দেয়ার কমপ্রেসার মেশিনের নল ঢুকিয়ে দেয় তার মলদ্বারে। এরপর চালু করে দেয়া হয় কমপ্রেসার। শিশু রাকিবের দেহে বাতাস ঢুকে ছিঁড়ে যায় পেটের নাড়িভুঁড়ি। ফেটে যায় ফুসফুসও। এরও আগে সিলেটে চুরির অভিযোগে শিশু সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বরগুনায় মাছ চুরির অভিযোগে রবিউল আউয়াল নামে ১১ বছরের এক শিশুকে শাবল দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এর মাস খানেক আগে গাইবান্ধায় গরু চুরির অভিযোগে আরিফ মিয়া (১৩) নামের এক কিশোরের পা ভেঙ্গে দিয়েছে নির্যাতনকারীরা। এভাবেই প্রতিনিয়ত ঘটছে শিশু নির্যাতন ও নির্যাতন পরবর্তী হত্যাকা-। কী অমানবিক! 
সমাজে নানামাত্রিক নিষ্ঠুরতা রেকর্ড মাত্রায় বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, গত সাড়ে তিন বছরে দেশে ৯৬৮টি শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। গত বছর শিশুহত্যার হার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি ছিল। এ বছর হত্যার পাশাপাশি নৃশংসতাও বেড়েছে। শিশু অধিকার নিয়ে কর্মরত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু ধর্ষণসহ অন্যান্য নির্যাতনের পাশাপাশি বর্তমানে শিশুহত্যার সংখ্যা বেড়েছে। 
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালে সারা দেশে ২৮ প্রতিবন্ধী শিশুসহ ৫৭১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৬ শিশুকে ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে। এদিকে একই বছরে ৮১২ শিশু বিভিন্ন ধরনের যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তথ্য মতে, ‘শিশু অধিকার সংরক্ষণে ২০১৮-এর পরিস্থিতি’-শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ ছাড়া এবারের প্রতিবেদনে এমন বিষয় সামনে এসেছে যে, ২০১৮ সালে ৪৩ শিশু উত্ত্যক্তের এবং ৮৭ শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। বখাটেদের হাতে লাঞ্ছনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে ১৮টি। আমরা বলতে চাই, এমন তথ্য যখন সামনে এলো তখন সংশ্লিষ্টদের আমলে নেয়া অপরিহার্য যেÑএই পরিস্থিতি কতটা ভয়ানক।
দেশে প্রায় প্রতিদিনই শিশু নির্যাতনের মতো অমানবিক ঘটনা ঘটছে। আর বিষয়টি দিন দিন বেড়ে ওঠার একটাই কারণ, তা হলো আইনের নিরবতা এবং আইনের লোকগুলো অপরাধীদের কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যাওয়া। শিশু নির্যাতনের বিষয়টি কোনো নতুন বিষয় না। এটি একটি পুরনো বিষয় অনেক আগে থেকে ধারাবাহিকভাবে হয়ে আসছে। এখন যেহেতু এ ধরনের ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে তার মানে বুঝতে হবে এ সময় এর মাত্রাটা বেড়ে গেছে।
ওয়ারীতে সাত বছরের শিশু সায়মাসহ আরো অন্যান্য যেসব শিশুকে মানুষরূপী জানোয়াররা নির্যাতন করে হত্যা করেছে তাদেরকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় এনে কঠিন শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এ বিষয়ে সরকার এবং সরকারের আইন প্রশাসন চরমভাবে ব্যর্থ! এজন্যই অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। 
বিভিন্ন সময়ে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের কথা বলা হলেও সম্প্রতি এর মাত্রা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। শিশুদের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতা এখন আর কোনো আকষ্মিক বা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। এটি যেন নিত্যদিনের ঘটনা। যারা নির্যাতন করছে এবং যারা নির্যাতিত হচ্ছে তাদের মধ্যে সামাজিক শ্রেণি বিন্যাসের পার্থক্য তেমন নেই। যে যার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারছে, তাকেই নির্যাতন করছে। এক ধরনের হতাশা ও দাম্ভিকতা থেকে এ ধরনের পৈশাচিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। যে নির্যাতন চালাচ্ছে, সে জানে যে ওই শিশু বা তার পরিবারের কোনো বিচার পাওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই এ ধরনের অপরাধীরা দিন দিন উৎসাহিত হচ্ছে। 
বর্তমান কল্পনাতীত ধর্ষণ ও ধর্ষণপ্রবণতার বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে বড় ধরনের সামাজিক গবেষণার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ কেন এতটা বেপরোয়াভাবে যৌনতাতাড়িত হয়ে পড়ছে, কেনই বা ধর্ষণপ্রবণদের মধ্যে কাজ করছে না কোনো ধরনের ভয়ভীতি, এটা এখন এক বড় প্রশ্ন। ধর্ষকদের কেউ কেউ গ্রেপ্তারও হচ্ছে। অথচ সেসব দৃষ্টান্ত কোনোই কাজে আসছে না। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ধর্ষণপ্রবণতা এক অপ্রতিরোধ্য মানসিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে-যা শুধু আইন প্রয়োগ করেই দমানো যাবে না। প্রকৃতপক্ষে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে এবং তাই সে মানতে চাইছে না কোনো কিছুই- আইন-আদালত, সামাজিক সম্মানবোধ, আত্মসম্ভ্রম। আমরা মনে করি, ধর্ষণ রোধে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি এই প্রবণতার কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। ধর্ষণপ্রবণতার পেছনে দেশের প্রচলিত রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা কতটা দায়ী সেটাও অনুধাবন করার প্রয়োজন পড়েছে। আর্থিক দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে দেশ, এই দুর্নীতি হয়তো মানুষকে উৎসাহী করছে চারিত্রিক অন্যান্য স্খলনেও। অনেকেই বলছেন, সমাজটা যেহেতু ভোগবাদী হয়ে পড়েছে, তাই মানুষ নানা ধরনের ভোগে প্রলুব্ধ হতেই পারে। এই প্রলুব্ধতার পেছনে কোনো ধরনের নৈতিকতা কাজ করছে না।
শিশু আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি তার হেফাজতে, দায়িত্বে বা পরিচর্যায় থাকা কোনো শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, বর্জন, অরক্ষিত অবস্থায় পরিত্যাগ, ব্যক্তিগত পরিচর্যার কাজে ব্যবহার বা অশালীনভাবে প্রদর্শন করে, যাতে সংশি¬ষ্ট শিশুর দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণ শক্তি নষ্ট হয়, শরীরের কোনো অঙ্গ বা ইন্দ্রিয়ের ক্ষতি হয় বা কোনো মানসিক বিকৃতি ঘটে, তিনি এই আইনের অধীন অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে এবং ওই অপরাধের জন্য তিনি অনধিক পাঁচ বছর কারাদ- অথবা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবেন। এখানে শিশু হত্যাকারী বিচারের মুখোমুখি হবে জানা থাকা সত্ত্বেও কেন মানুষ শিশুদের এমন জঘন্য পন্থায় হত্যা করছে তা জাতির জন্য অশনি সংকেত। তাই সবাইকে আজ জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার কথা ভাবতে হবে। শিশুদের জন্য কাক্সিক্ষত নিরাপদ আবাস ও সুন্দর পৃথিবীর উপহার আমাদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে। সোচ্চার হতে হবে সচেতন ও বিবেকবানদের।

লেখক: কবি-সাংবাদিক

Dream Sylhet
ড্রীম সিলেট
ড্রীম সিলেট
এই বিভাগের আরো খবর