বুধবার   ২৪ জুলাই ২০১৯   শ্রাবণ ৮ ১৪২৬   ২১ জ্বিলকদ ১৪৪০

২৬৮

অপুষ্টি প্রতিরোধে ‘সূচনা’র আশাজাগানিয়া সাফল্য

আফরোজা ইসলাম

প্রকাশিত: ২০ জুন ২০১৯ ২০ ০৮ ২৮  

দেশে অপুষ্টিতে ভূগছে আড়াই কোটি মানুষ। পুষ্টির অভাবে দেশের ৩৬ ভাগ শিশু খর্বাকায়- প্রতি বছর জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহে সংবাদপত্রে এমন খবর আমাদেরকে বিষন্ন করে। 

শিশুর পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে মাকে পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। মায়ের যত্ন নিতে হবে। একজন গর্ভবতী মা অপুষ্টিতে ভুগলে তাঁর শিশুটিও অপুষ্টিতে ভুগবে। আর সেই শিশু যদি মা হয়, তাহলে তার সন্তানও অপুষ্টিতে ভুগবে। 
তাই গর্ভবতী মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করতে বহুমাত্রিক সেবা কার্যক্রম নিয়েছে ‘সূচনা’। যুগান্তকারী এই সেবা কার্যক্রম প্রান্তিক জনগোষ্ঠির মাঝে যেমন হাসি ফুটিয়েছে তেমনি ঈর্ষনীয় সাফল্যেও আশা জাগিয়েছে।

এই কার্যক্রম সিলেট ও মৌলভীবাজারের ২০টি উপজেলা তথা ১৫৭টি ইউনিয়নে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আগামী ২০২২ সালের মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার পরিবারকে এই প্রকল্পের আওতায় আনার প্রচেষ্টা চলছে। আর্ন্তজাতিক সেবা সংস্থা ‘সেভ দি চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ’র নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে ‘সূচনা’ নামের এই প্রকল্প। প্রকল্প বাস্তবায়নে আটটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। ১ লাখ ৭৩ হাজার ১৪ জন দরিদ্র এবং হতদরিদ্ররা এ প্রকল্পের আওতায় সুবিধা ভোগ করছে।

‘সূচনা’ প্রকল্পটি ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে শুরু হয়। এটি ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে। 

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রজাতির বীজ, মাছের পোনা ও বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তির সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, তাদের অর্থনৈতিক সহযোগিতাও দেওয়া হচ্ছে।

গর্ভকালীন থেকে শিশুর বয়স দুই বছর হওয়া পর্যন্ত পুষ্টি নিশ্চিতকরণের বিষয়টি সূচনা প্রকল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রয়েছে। এ ছাড়া নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিও সূচনা প্রকল্পে গুরুত্বসহকারে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

ইতোমধ্যেই স্থানীয় সরকারের সহযোগিতায় সিলেট-মৌলভীবাজারের ২৩ হাজার ১৪৫ জন দরিদ্র ও হতদরিদ্রদের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে।

বর্তমান সরকার পুষ্টি নিয়ে অনেক আগে থেকেই কাজ করে আসছে। নির্বাচনী ইশতেহারে পুষ্টিকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি সরকার বহুমুখী পুষ্টি নীতি ও পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

পুষ্টিহীনতা মানে কী? পুষ্টিহীনতার দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো নিউট্রিশন বা পুষ্টির অভাব, আরেকটি হলো রক্তশূন্যতা। যখন কোনো মায়ের মধ্যে পুষ্টিহীনতা ও রক্তশূন্যতা থাকে তাহলে তাঁর সন্তানের ওপর এর ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়ে। তাঁর অনাগত সন্তানও এই রোগে আক্রান্ত হয়। আমাদের দেশে মেয়েদের খাবাবের বিষয়ে অনেক কুসংস্কার আছে। আর পুষ্টির ব্যাপারে ছেলেকে বেশি প্রাধাণ্য দেওয়া হয়ে থাকে। এখন এই ধারণার অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। তবে আগের যে ঘাটতি রয়ে গেছে তা আরো কিছু সময় আমাদের বয়ে নিয়ে যেতে হবে। আবার যখন কোনো নারী সন্তানসম্ভবা হন তখন মেয়ের মা ও শ্বাশুড়ি তাঁকে কম খাবার দেন। তাঁদের ধারণা কম খেলে বাচ্চা ছোট হবে এবং জন্ম দেওয়ার সময় মায়ের কষ্ট কম হবে। এটাও একটা বড় কারণ পুষ্টিহীনতার। মা যদি পুষ্টিকর খাবার খান এবং সেই সময় মিনারেল, ভিটামিন তাদের সঠিক উপায়ে দেওয়া হয় তাহলে দেখা যাবে তার যে সন্তান হবে সে সুস্বাস্থ্য নিয়ে জন্ম নেবে এবং সে অনেক রোগ থেকে বেঁচে যাবে। অপুষ্টির কারণে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। আর যখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় তখন বাচ্চা ও মা দুজনেরই যেকোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

একজন মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এটা কীভাবে বোঝা যাবে? যে অপুষ্টিতে ভুগছে সে সবসময় নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। তার খেলাধূলা-কাজের প্রতি আগ্রহ কম থাকবে, সব সময় এক ধরনের অবসন্ন ভাব থাকবে, সারাক্ষণ শুয়ে বসে কাটাবে, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যাবে, প্রচুর ঘুমাবে-এ ধরনের লক্ষণ দেখে বোঝা যাবে সে অপুষ্টিতে ভুগছে এবং এটাও খেয়াল রাখতে হবে তার বয়স অনুযায়ী উচ্চতা ঠিক আছে কি না এবং উচ্চতা অনুযায়ী তার স্বাস্থ্য ঠিক আছে কি না এবং সেই পরিমাণ ওজন তার আছে কি না। যার পুষ্টি কম তার ওজনও কম থাকবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টির প্রধান কারণ জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, পুষ্টি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও জনসচেতনতার অভাব। দরিদ্র পরিবারে খাদ্যের সহজলভ্যতা না থাকার সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছল ও অবস্থাপন্ন পরিবারেও শিশুদের অপুষ্টির শিকার হতে দেখা যাচ্ছে। পুষ্টিকর খাবার না দিয়ে তারা শিশুদের আবদার মেটাতে পানীয়, জুস ও চিপস দিচ্ছে। জাঙ্ক ফুডের কারণেও শিশুদের শরীরে ক্ষতি হচ্ছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বা কম খেতে দেয়াও অপুষ্টির কারণ। বয়স অনুপাতে কতোটুকু খাবার, কী খাবার, কতক্ষণ পর খাবে, তা অনেক মা-বাবা বুঝতে পারেন না। অপুষ্টি দূর করতে শিশুর সুষম খাদ্য গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এটা শুধু শিশুই নয়, কিশোর-কিশোরীসহ সব বয়সের মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

তারা আরো বলেন, রক্তস্বল্পতা, ঠোঁটের কোণায় ঘা, পেটের অসুখ, চোখের নানা সমস্যা, চর্মরোগ, আমাশয়, চুলপড়া, পেটে কৃমি, শারীরিক গঠন সঠিক না হওয়া ও স্নাযুতন্ত্রে বিকাশ ব্যাহত ইত্যাদি অপুষ্টির কারণে হয়ে থাকে। অনেকে মনে করেন, বেশি দুধ ও মাংস খেলে স্বাস্থ্য ভালো হয়। কিন্তু তা নয়, শিশুসহ প্রতিটি মানুষের বয়স অনুপাতে মিশ্র খাবার অর্থাৎ সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে। সে জন্য মাংস ও দুধের সঙ্গে মাছ, ডিম, ডাল, ভাত, সবজি, ফলমূল খেতে হবে।

অপুষ্টির শিকার যেহেতু মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠী, তাই প্রধান কর্তব্য-দারিদ্র্য দূর করা। এ ছাড়া অতি মাত্রায় ভাত নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন। খাদ্যতালিকায় আমিষ ছাড়াও শাকসবজি, ডাল ইত্যাদি আরও বেশি পরিমাণে যুক্ত করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

চিকিৎসকদের মতে, অপুষ্টি একটি মারাত্মক জনসমস্যা। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কোন খাবারে কি পরিমাণ পুষ্টি রয়েছে সে সম্পর্কে অভিভাবকদের সঠিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। সমাজে কিছু সমস্যা রয়েছে, যা শিশু অপুষ্টির কারণ, তা হলো মাতৃদুগ্ধের বিকল্প খাদ্যের ব্যবহার। নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমেও বিকল্প এ মাতৃদুগ্ধ মা’র হাতে পৌঁছে থাকে।

একজন সুস্থ মানুষ দেশ ও জাতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। অপুষ্টিতে ভোগে এমন মানুষ দেশের জন্য বেশি কিছু করতে পারেন না। তাই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া একান্ত জরুরি। এ জন্য সবার আগে পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের বর্তমানে পুষ্টি সমস্যা সমাধানে অনেক সক্রিয় নীতি রয়েছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলেই কেবল ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবান জাতি তৈরি সম্ভব হতে পারে। 

Dream Sylhet
ড্রীম সিলেট
ড্রীম সিলেট